মহা শিবরাত্রি বা ভারতে শিবরাত্রি কী?

মহা শিবরাত্রি বা শিবরাত্রি হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের নিকট একটি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান যা ‘পদ্মরাজারথ্রী’ এবং ‘শিবের মহান রাত’ নামেও পরিচিত। সাধারণত শিবরাত্রি প্রতি মাসের ১৪ তম দিনে, অমাবস্যার একদিন পূর্বে পালিত হয়। এক বছরে উদযাপিত ১২ টি শিবরাত্রীর মধ্যে মহাশিবরাত্রি সাধারণত গ্রহের অবস্থানের উপর নির্ভর করে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে পালিত হয়। বাংলায় যা মাঘ বা ফাল্গুন মাসের ১৩ তম বা ১৪ তম দিনে। যেখানে মহাদেব শিবের উপাসনা করা হয়। যেটি কেবল একদিন এবং রাতে পালন করা হয়। মহাশিবরাত্রি হল হিন্দুধর্মের সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবাদিদেব মহাদেব ‘শিবের’ মহা রাত্রি। শিবের ভক্ত বিশেষ করে মেয়েরা এইদিন শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল, দুধ, বেলপাতা, ফুল দিয়ে পূজা করে থাকে। বলে রাখি মহা শিবরাত্রি বা শিবরাত্রির দিন স্কুল, কলেজ, সরকারী অফিস এবং বেশিরভাগ ব্যবসা বন্ধ থাকে।

শিবরাত্রি কেন পালন করা হয়?

হিন্দু মহাপুরাণ তথা শিবমহাপুরাণ অনুসারে এইরাত্রেই শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মহা তান্ডব নৃত্য করেছিলেন। আবার এইরাত্রেই শিব ও পার্বতীর বিবাহ হয়েছিল। এর নিগুঢ় অর্থ হল শিব ও শক্তি তথা পুরুষ ও আদিশক্তি বা পরাপ্রকৃতির মিলন। এই মহাশিবরাত্রিতে শিব তার প্রতীক লিঙ্গ তথা শিবলিঙ্গ রূপে প্রকাশিত হয়ে জীবের পাপনাশ ও মুক্তির পথ দিয়েছিলেন। দিনটি জীবন এবং পৃথিবীতে অন্ধকার এবং অজ্ঞতা কাটিয়ে ওঠার স্মৃতি স্মরণ করে। এই দিনে ভক্তরা শিবের উপাসনা করেন, কঠোর উপোস পালন করেন এবং শিবকে সন্তুষ্ট করতে বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মকাণ্ড করে থাকেন। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে শুভ শিবরাত্রি দিবসে ভগবান শঙ্করকে সন্তুষ্ট করে একজন ব্যক্তি অতীতের পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে যায় এবং মোক্ষ বা পরিত্রাণ লাভ করে। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ বিশেষ করে মেয়ের আরও বিশ্বাস করেন যে শিবরাত্রীর দিন ব্রত রেখে সরাদিন উপোস থেকে দেবাধিদেব মহাদেব শিবের আরাধনা করে সন্তুষ্ট করতে পারলে তারা সয়ং শিবের মতো একটা বর বা স্বামী পাবেন।

মহা শিবরাত্রি কীভাবে পালিত হয়?

মহা শিবরাত্রিতে ভক্তরা সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে গঙ্গা নদীর পবিত্র জলে পূজা করে স্নান করেন। এরপরে, ভক্তরা তাজা নতুন পোশাক পরে নিকটতম শিব মন্দিরে যান এবং দুধ, দই, মধু, ঘি, চিনি এবং জল সহ ছয়টি ভিন্ন দ্রাব্য দিয়ে শিবলিঙ্গে জলবিশেক করেন, এই ছয়টি জিনিস শিবরাত্রির একটি অপরিহার্য অঙ্গ। এরপরে ভক্তরা শিবলিঙ্গে সাদা ফুল, পদ্ম ফুল, ধুতুরা ফুল দেয় এবং বেলপাতা অনেক গুরুত্ব বহন করে, কিছু ভক্ত শিব লিঙ্গে ১০৮, ১১০৮ বেলপাত্র সরবরাহ করে। ভক্তরা ধূপের কাঠি, হালকা প্রদীপ জ্বালান, সাদা কাপড়, মিষ্টি, যে কোনও পাঁচটি ফল এবং পঞ্চমৃত উপহার দেন।
মহা শিবরাত্রিতে শিবের এই আনুষ্ঠানিক উপাসনাটি দিনরাত অব্যাহত থাকে। সন্ধ্যায় শিব লিঙ্গ পূজার জন্য মন্দিরে যাওয়ার আগে আবার স্নান করা উচিত। যে সমস্ত ভক্তরা কোনও কারণে মন্দিরে যেতে পারেন না তারা বাড়িতে পূজা করতে পারেন। ভক্তরা জেগে থাকেন এবং শিব মন্দিরগুলিতে ‘ওম নমঃ শিবায়া’ উচ্চারণ করে এবং ভগবান শঙ্করের প্রশংসায় স্তব ও শ্লোক গেয়ে রাত কাটান।
ভক্তরা মহা শিবরাত্রির পরের দিন সকালে শিবকে অর্পণ করা প্রসাদ গ্রহণ করে উপবাস ভাঙেন। বিবাহিত মহিলারা তাদের স্বামী ও পুত্রের মঙ্গল কামনা করে মহা শিবরাত্রিতে উপবাস পালন করার জন্য প্রার্থনা করেন, অন্যদিকে অবিবাহিত মহিলারা শিবের মতো স্বামীর জন্য প্রার্থনা করেন।

ব্রতকথা –

হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন পূজাতে ব্রত রাখা হয়। তবে সব ব্রতগুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হল এই মহাশিবরাত্রি। ব্রতের আগের দিন ভক্তগণ নিরামিষ আহার করে। ব্রতের দিন তারা উপোষ থাকে। তারপর রাত্রিবেলা চার প্রহরে শিবলিঙ্গকে দুধ, দই, ঘৃত, মধু ও গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করানো হয়। তারপর বেলপাতা, নীলকন্ঠ ফুল, ধুতুরা, আকন্দ, অপরাজিতা প্রভৃতি ফুল দিয়ে পূজা করা হয়। আর ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ এই মহামন্ত্র জপ করা হয় । সেদিন রাত্রি জাগরণ করা হয় ও শিবের ব্রতকথা এবং মন্ত্র আরাধণা করা হয়।

শিবচতুর্দশী ব্রতের প্রচার –

শিবমহাপুরাণ অনুসারে, অতি প্রাচীনকালে বারাণসী তথা কাশীধামে এক নিষ্ঠুর ব্যাধ বাস করত। সে প্রচুর জীবহত্যা করত। একদিন শিকারে বেরিয়ে তার খুব দেরী হওয়ার ফলে সে জঙ্গলে পথ হারিয়ে রাতে হীংস্র জন্তুর ভয়ে এক গাছের উপর আশ্রয় নেয় । কোনো শিকার না পেয়ে সে হতাশ হয়ে গাছ থেকে একটা করে পাতা ছিঁড়ে নিচে ফেলতে থাকে । সেই গাছটি ছিল বেলগাছ । আর সেই বেলগাছের নিচে একটি শিবলিঙ্গ ছিল। সেদিন ছিল শিবচতুর্দশী অর্থাৎ মহাশিবরাত্রি। আর ব্যাধও ছিল উপবাসী। তার ফেলা বেলপাতাগুলো শিবলিঙ্গের মাথায় পড়ে এর ফলে তার শিবচতুর্দশী ব্রতের ফল লাভ হয় তার অজান্তেই। পরদিন ব্যাধ বাড়ী ফিরে এলে তার খাবার সে এক অতিথিকে দিয়ে দেয়। এতে তার ব্রতের পারণ ফল লাভ হয়।
এর কিছুদিন পরে সেই ব্যাধ মারা গেলে যমদূতরা তাকে নিতে আসে। কিন্তু শিবচতুর্দশী ব্রতের ফল লাভ হেতু শিবদূতরা এসে যুদ্ধ করে যমদূতদের হারিয়ে ব্যাধকে নিয়ে যায়। যমরাজ তখন শিকার করেন যে শিবচতুর্দশী ব্রত পালন করে এবং শিব বা বিষ্ণুর ভক্ত যেই জন, তার উপর যমের কোনো অধিকার থাকেনা। সে মুক্তিলাভ করে। এইভাবে মর্ত্যলোকে শিবচতুর্দশী ব্রতের প্রচার ঘটে।

প্রতি প্রহরের পুজোর আচার ও বিধি –

শিবরাত্রির পুজো চার প্রহরে করতে হয়।
• প্রথম প্রহর – দুধ দ্বারা স্নানের মন্ত্র: ‘ইদং স্নানীয় দুগ্ধং ওঁ হৌং ঈশানায় নমঃ’৷ এই মন্ত্রটি বলে শিবকে দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে একটি অর্ঘ্য নিবেদনের পরে জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।
• দ্বিতীয় প্রহরের পূজা – দই দিয়ে স্নানের মন্ত্র: ‘ইদং স্নানীয় দধিং ওঁ হৌং অঘোরোয় নমঃ’৷ এই মন্ত্রটি বলে শিবকে দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে একটি অর্ঘ্য নিবেদনের পরে জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।
• তৃতীয় প্রহরের পূজা – ঘি দিয়ে স্নানের মন্ত্র: ‘ইদং স্নানীয় ঘৃতং ওঁ হৌং বামদেবায় নমঃ’৷ এই মন্ত্রটি বলে শিবকে দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে একটি অর্ঘ্য নিবেদনের পরে জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।
• চতুর্থ প্রহরের পূজা – মধু দিয়ে স্নানের মন্ত্র: ‘ইদং স্নানীয় মধুং ওঁ হৌং সদ্যজাতায় নমঃ’৷ এই মন্ত্রটি বলে শিবকে দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে একটি অর্ঘ্য নিবেদনের পরে জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।

শিবরাত্রি এবং মহাশিবরাত্রির মধ্যে পার্থক্য কী?

শিবরাত্রি শব্দটি শিব এবং রাত্রি দুটি শব্দের সংমিশ্রণ দ্বারা গঠিত, যেখানে শিবের অর্থ ‘ভগবান শিব’ এবং রাত্রির অর্থ রাত। তাই শিবরাত্রি মানেই শিবের রাত।
শিবরাত্রি প্রতি মাসের ১৪ তম দিনে, অমাবস্যার একদিন পূর্বে উদযাপিত হয়, তাই প্রতি মাসে কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে পূর্ণিমা পূর্ণ হয় কেবল শিবরাত্রি বলে। এক বছরে উদযাপিত ১২ শিবরাত্রীর মধ্যে মহাশিবরাত্রি হ’ল ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে সাধারণত গ্রহের অবস্থান অনুসারে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে পালিত হয়।

বাড়িতে শিবলিঙ্গ রাখার আগে জেনে নিন –

প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, মহাদেবকে শুধুমাত্র একটু বেলপাতা দিলেই নাকি তিনি তুষ্ট হন। কিন্তু আদতে মহাদেবকে তুষ্ট করাই সবচেয়ে কঠিন। যুগের পর যুগ ভক্তিভরে তাঁর তপস্যা করে যেতে হয় মনে কোনও লোভ বা অভিসন্ধি না রেখে। তবেই তিনি একদিন প্রসন্ন হন।
কিছু বিষয় –
১. শিবলিঙ্গে প্রাণ প্রতিষ্ঠা একটি বিরাট জটিল প্রক্রিয়া। যে কোনও পুরোহিত সেটি করতে পারেন না। তাই তেমন কাউকে দিয়ে এই কাজ করাতে গিয়ে যদি কোনও ত্রুটি হয়, তবে বিপদ!
২. প্রাণ-প্রতিষ্ঠা ঠিকঠাক হলেও বেশ কিছু অন্য বিপদ রয়েছে। নিত্যপূজা এবং স্নান ঠিকমতো হতে হবে। না-হলে দেবতা অসন্তুষ্ট হবেন এবং গৃহস্থকে নানা সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
৩. শিবের অভিষেক করতে হয় পাঁচটি উপকরণ দিয়ে – ঘি, মধু, দই, দুধ এবং গঙ্গাজল। গঙ্গা যে অঞ্চলে নেই, সেখানে ডাবের জল ব্যবহার করা যায় আবার পঞ্চনদীর জলও ব্যবহৃত হয়। বাণলিঙ্গ না রেখে বাড়িতে অন্য শিবলিঙ্গ রাখলে কিন্তু প্রতিদিন এগুলি দিয়ে অভিষেক করতে হবে, যা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়।
৪. বাড়িতে যদি অশৌচ হয়, তবে ঠাকুর ছোঁয়া যায় না প্রচলিত রীতি অনুযায়ী। লক্ষ্মী বা শ্রীকৃষ্ণের পুজো এই সময়ে বন্ধ রাখা গেলেও বাড়িতে শিবলিঙ্গ থাকলে তা সম্ভব নয়। অভিষেক করতেই হবে। তার জন্য কোনও পুরোহিত নিযুক্ত করতে হবে অথবা প্রতিবেশীর সাহায্য নিতে হবে।
৫. এছাড়া বলা হয়, শিব যেহেতু ‘পারফেকশনিস্ট’, তাই বিন্দুমাত্র ত্রুটি তিনি সহ্য করেন না। একটু উনিশ-বিশ হলেই তাঁর ক্রোধের উদ্রেক হতে পারে। তাই তাঁকে বাড়িতে রেখে বিপদ না বাড়ানোই ভাল।

শিবরাত্রির দিন এই ১১টি বিষয় ভুলবেন না –

আর দু’দিন পরেই শিবরাত্রি। কথিত রয়েছে, এই দিন ভক্তি ভরে পুজো করলে জীবনের বহু সমস্যা থেকে সমাধান মেলে। কিন্তু অনেকেই জানেন না পুজোর সঠিক রীতি। শুধু বাঙালি নয়, সারা ভারতজুড়েই শিবরাত্রি নিয়ে আলাদা আবেগ রয়েছে। এই বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি শিবরাত্রি। কথিত আছে, এই দিনে যাঁরা উপোস করে থাকেন, সারা বছর তাঁদের ভাল কাটে।

  1. প্রথমত, সারাদিন উপোস করে থাকতে হবে।
  2. ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পড়ুন। গরম জল আর তিল দিয়ে স্নান করে নিজেকে শুদ্ধ করুন।
  3. পুজো শুরুর প্রথমে শিবলিঙ্গটিকে দুধ, জল এবং মধু দিয়ে স্নান করান। পুজোর জন্য বেলপাতা, আকন্দ ফুল, কুমকুম এবং চন্দন আবশ্যিক।
  4. বলা হয়, শিবকে দুধ কিংবা ক্ষীরই অর্পণ করা উচিৎ। তবে ভাঙ দিলেও ভগবান শিব খুশি হন।
  5. পুজোর সময় পূজারীকে ‘ঔঁ নমঃ শিবায়ঃ’ মন্ত্রটি জপ করতে হবে।
  6. শিবরাত্রির দিন সকাল থেকে উপোস শুরু হয় এবং উপোস শেষ হয় পরের দিন সকালে। যিনি উপোস করছেন, তিনি দুধ, ফল ইত্যাদি খেতে পারেন। তবে সূর্যাস্তের পরে কোনওকিছু খাওয়া চলবে না।
  7. যিনি উপোস করছেন, তাঁকে সারা রাত জেগে থাকতে হবে, এবং ভক্তিগীতি গাইতে হবে। পরের দিন ভোরবেলা উপোস ভাঙতে হবে পুজোর প্রসাদ খেয়ে।
  8. শিবের তিলক তৈরি করতে হবে দুধ, গোলাপ জল, চন্দন, দই, মধু, ঘি, চিনি, এবং জল দিয়ে।
  9. কথিত রয়েছে, শিবরাত্রির দিন গঙ্গায় ডুব দিলে সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়।
  10. চার প্রহর ধরে শিব লিঙ্গের পুজো হয়। প্রথম প্রহরে জল দিয়ে, দ্বিতীয় প্রহরে দই দিয়ে, তৃতীয় প্রহরে ঘি দিয়ে এবং চতুর্থ প্রহরে মধু দিয়ে শিব লিঙ্গের অভিষেক করতে হবে।
  11. পুজো শেষের পরে আরতির সময়ে শিবের একশো আটটি নাম জপ করতে হবে।